সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ডিজিটাল দাসত্ব ও মেধার অপমৃত্যু: অ্যালগরিদমের ফাঁদে আমাদের ভবিষ্যৎ

 ওয়াসিম হোসেন

বর্তমানে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের ব্যবহারকারীর সংখ্যা দেশের সক্রিয় জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে স্পর্শ করেছে। আপাতদৃষ্টিতে একে প্রযুক্তির অগ্রগতি বা যোগাযোগের সহজলভ্যতা মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়। আমরা কি আসলেই প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তি আমাদের ব্যবহার করে এক ধরনের "মানসিক প্রতিবন্ধী" সমাজে রূপান্তর করছে? এই প্রশ্নটি আজ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ডোপামিন হ্যাক মস্তিষ্কের দাসত্ব

বিজ্ঞান বলছে, ফেসবুক বা জাতীয় প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি। ক্যাসিনোর জুয়ার স্লট মেশিনের মতো এখানে যুক্ত করা হয়েছেভ্যারিয়েবল রিওয়ার্ডসবা অনিশ্চিত পুরস্কারের লোভ। প্রতিবার স্ক্রিন স্ক্রল করার সময় মস্তিষ্ক এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করে এবং ক্ষরিত হয়ডোপামিননামক হরমোন। এই সস্তা কৃত্রিম আনন্দের প্রতি আসক্ত হয়ে মানুষ হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক মনোযোগের ক্ষমতা (Attention Span) ফলে দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষা, বই পড়া বা গভীর চিন্তাভাবনার মতো উৎপাদনশীল কাজগুলো তরুণ প্রজন্মের কাছে আজ চরম বিরক্তিকর মনে হয়।

কর্মঘন্টার মহাবিনাশ অর্থনৈতিক বৈষম্য

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, তার হিসাব এখন অসীমের দিকে ছুটছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি সম্পূর্ণ অর্থহীন, বার্তালাপহীন ফানি ভিডিও যখন লাখ লাখ বা মিলিয়ন ভিউ পায়, তখন সামষ্টিক হিশাবে মানবজীবনের কয়েক বছর বা দশক সমপরিমাণ সময় নিমিষেই কর্পোরেট সার্ভারের পেটে চলে যায়।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো এই বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্য। দেশের লাখ লাখ মানুষের কোটি কোটি ঘণ্টারওয়াচ টাইমপুঁজি করে বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিজ্ঞাপন। আর এর বিনিময়ে স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে সামান্য কিছু ডলার। এই সস্তা উপার্জনের লোভে দেশের শিক্ষিত, বেকার তরুণ-তরুণীদের একটি বিশাল অংশ আজ কোনো বাস্তব দক্ষতা অর্জন না করে সস্তা বিনোদন বা কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরির প্রতিযোগিতায় নামছে। এতে ব্যক্তিচরিত্রের যেমন অবক্ষয় ঘটছে, তেমনি রাষ্ট্র হারাচ্ছে এক বিশাল উৎপাদনশীল জনশক্তি।

ব্যক্তিত্বের বিলোপ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই কৃত্রিম মায়াজাল মানুষের বাস্তব সম্পর্কগুলোকে বিষাক্ত করে তুলছে। আজ ঘরের ভেতর মা-বাবা, ভাই-বোন কিংবা জীবনসঙ্গীর চেয়েও অনেকের কাছে বেশি আপন হয়ে উঠেছে ফেসবুকের নিউজফিড। মানুষ নিজের বিবেক, সংস্কৃতি স্বকীয়তা হারিয়ে অ্যালগরিদমের ইশারায় চালিত এক রোবটে পরিণত হচ্ছে। নোটিফিকেশনের একটি লাল রঙের বৃত্ত কিংবা লাইক-কমেন্টের সংখ্যা দিয়ে মানুষ আজ নিজের যোগ্যতা পরিমাপ করছে, যা তীব্র মানসিক হীনমন্যতা বিষণ্ণতার জন্ম দিচ্ছে।

মুক্তির পথ: নিজেকে জানার আহ্বান

ইতিহাস সাক্ষী, যেকোনো দেশের সমাজ জনমতকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এখন এই সোশ্যাল মিডিয়া। এই অদৃশ্য উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো আত্মোপলব্ধি এবং কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সেই কালজয়ী আহ্বান"নিজেকে জানো"আজকের এই ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। আমাদের বুঝতে হবে, ফেসবুক আমাদের পছন্দ-অপছন্দ ট্র্যাক করে আমাদের চেয়েও আমাদের বেশি চেনে এবং সেই দুর্বলতা ব্যবহার করেই আমাদের আটকে রাখে।

এই ডিজিটাল দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের স্ক্রিন বন্ধ করে বাস্তব পৃথিবীর মুখোমুখি হতে হবে। প্রযুক্তি যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, বরং আমরাই যেন প্রযুক্তির লাগাম টেনে ধরতে পারিসেই সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। সস্তা ভিউ আর লাইকের পেছনে না ছুটে নিজের মেধা, সৃজনশীলতা ব্যক্তিত্বকে চেনা এবং তাকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোই হোক এই সময়ের প্রধান অঙ্গীকার।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বুদ্ধিমত্তা কি?

আমেরিকার হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী হাওয়ার্ড গার্ডনার প্রদত্ত মানুষের বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক গবেষণায় দেখা যায় যে, মানুষের কমপক্ষে আট ধরণের বুদ্ধিমত্তা রয়েছে। এ বুদ্ধিমত্তার মাত্রাও সকলের সমান নয়। প্রত্যেকেই একাধিক বুদ্ধিমত্তা প্রবল। সাধারণত কেউ কোনটাতে প্রবল আবার অন্যটিতে দুর্বল। আচরণ ও কার্যকলাপের মাধ্যমে সহজেই পর্যবেক্ষণ করা যায়। তবে ভিন্ন ভিন্ন বুদ্ধিমত্তার লক্ষণগুলোও ভিন্ন ভিন্ন। বুদ্ধিমত্তা ৮ প্রকার যথাঃ মৌখিক ও ভাষাবৃত্তীয় বুদ্ধিমত্তা: যারা এ বুদ্ধিমত্তায় প্রবল তারা জটিল বিষয়ও সহজভাবে কথায় লিখে প্রকাশ করতে পারে। তাদের ভাষা থাকে প্রঞ্জল ও সাবলীল। তারা বই পড়া, কবিতা বা গল্প লেকা, আলোচনায় অংশগ্রহণ করা, কৌতুক বলা, সাহিত্য সৃষ্টি করা ইত্যাদি বেশি পছন্দ করে। তারা নতুন শব্দ লিখতে ভালবাসে। যৌক্তিক ও গাণিতিক বুদ্ধিমত্তা: যারা এ বুদ্ধিমত্তায় প্রবল তারা সমস্যা সহজে বুঝতে পারে এবং যুক্তি প্রয়োগ করে তা সমাধান করতে চায়। তারা সংখ্যা ও গাণিতিক সংজ্ঞা ও ফর্মুলা সহজে আয়ত্ব করে। এরা যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এবং বিশ্লেষণগত কাজ নিয়ে বেশি চিন্তা করে। ...

প্রোগ্রামিং ভাষা

                                      প্রোগ্রামিং ভাষা একজন মানুষ তার কার্য সম্পাদন ও মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য ভাষা ব্যবহার করে। যে মানুষ যে ভাষা জানে তার সাথে সেই ভাষায় কথা বলতে হয় । কিন্তু বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কম্পিউটার একটি মাত্র ভাষা বোঝে ,  আর তা হচ্ছে মেশিন ভাষা। মেশিন ভাষা কি ? ০ এবং ১ এ দুটি অংকের সমন্বয়ে মেশিন ভাষার উদ্ভব। সহজ কথায় ০ এবং ১ কে ব্যবহার করে নির্দেশ সাজিয়ে প্রোগ্রাম লেখার পদ্ধতিকে মেশিন ভাষার প্রোগ্রাম বলে। মেশিন ভাষায় লিখিত প্রোগ্রামের অপর নাম অবজেক্ট প্রোগ্রাম। মানুষের জন্য মেশিন ভাষা কঠিন তাই মানুষের ভাষার কাছাকাছি ভাষা  ( যেমন সি , সি ++)  যা অনুবাদক প্রোগ্রামের মাধ্যমে তা মেশিন ভাষায় রুপান্তর করা যায়। কম্পিউটার বা যেকোনো ডিভাইস দিয়ে আপনার নিজের কিংবা সারা বিশ্বের মানুষের জন্য কোন কাজ সম্পাদন করতে চাইলে প্রোগ্রামিং ভাষা জানতে হবে। প্রোগ্রামিং ভাষা কি ? কম্পিউটারের মাধ্যমে কোন প্রোগ্রাম রচনার জন্য ব্যবহৃত শব্দ , বর্ণ , অঙ্ক , ...

সহজেই কোডিং ছাড়া অ্যাপস তৈরী

সারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের যোগাযোগ সহজ থেকে সহজতর করে দিচ্ছে স্মার্টফোন । স্মার্টফোন কি ? পারসোনাল ডিজিটাল অ্যসিস্টেন্ট ( পি ডি এ ) আর মোবাইল ফোনের সম্মিলিত রূপই হচ্ছে  স্মার্টফোন । সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে হাজারও রকমের স্মার্টফোন । একদিকে মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে ঘনিষ্ট হয়ে যাচ্ছে , অন্যদিকে প্রতিনিয়ত এর ব্যাবহারকারী দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে । ব্যাবসা, বাণিজ্য, লেনদেন, লেখাপড়া ছাড়াও বহু কাজে ব্যবহার করা যায় স্মার্টফোন । আর স্মার্টফোনের প্রাণ হচ্ছে অ্যাপস ।   অ্যাপস কি ? অ্যাপস বা অ্যাপ্লিকেশন হচ্ছে বিশেষ ধরনের সফটঅয়্যার , যা শুধু স্মার্টফোন ডিভাইসে ব্যবহার করা যায় । যা গেম, ক্যালেন্ডার, মিউজিক প্লেয়ার থেকে শুরু করে ব্যবহারকারীর প্রয়োজনে যে কোনো ধরনের হতে পারে । বর্তমানে বিশ্বে কোম্পানিগুলোর প্রচুর অ্যাপস রয়েছে যা প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হচ্ছে । ক্রমানয়ে নতুন নতুন চাহিদা বা ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে । আর স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর উপযোগী করার জন্য যে কোনো  ধরনের অ্যাপস তৈরি করাই মুলত মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভলপমেন্ট ।   ...